নিউজ ডেস্ক:
মেট্রোরেলে যেসব স্থানে ঢাকাবাসীকে সংযুক্ত করা সম্ভব নয় সেসব গ্যাপ পূরণে মনোরেল নির্মাণের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা (১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার) ও উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার (১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার) রুটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এমন তথ্যই জানিয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এ দুটি মনোরেল চালু করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে ডিটিসিএ। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় আরও ছয়টি মেট্রোরেলের লাইন স্থাপনের সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
ঢাকায় ট্রাফিক জ্যাম কমাতে এবং নাগরিকদের দ্রুত চলাচলের জন্য মোট ছয়টি মেট্রোরেল বা এমআরটি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন ৬ উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চালু রয়েছে এবং বাকি লাইনগুলো নির্মাণ বা পরিকল্পনার পর্যায়ে। তবে আর্থিক অবস্থাসহ নানান কারণে ঢাকার সব সড়ককে মেট্রোরেল সংযোগের আওতায় আনা সম্ভব নয়।
ডিটিসিএ জানায়, প্রাথমিকভাবে দুটিসহ মোট পাঁচটি রুটে মনোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অন্য তিনটি রুট হলো—পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা (২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার), মধ্য বাড্ডা-ভুলতা (১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার), রামপুরা-ডেমরা (১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার)। এছাড়া বুয়েটকে আরও দুটি রুট নির্ধারণের জন্য সমীক্ষা করতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সাতটি রুটের মধ্যে চূড়ান্তভাবে দুটি রুটে মনোরেল চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে দুটি মনোরেলের কাজ ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করতে চায় ডিটিসিএ।
মনোরেল এমন একটি আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা যেখানে দুটি লাইনের পরিবর্তে একটি বিম বা রেলের ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল করে। ডিজাইন বা নকশার উপরে ভিত্তি করে ট্রেনে ৪ থেকে ৬টি বগি থাকে। মনোরেল ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম। তবে সবকিছু নির্ভর করে চূড়ান্ত ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ওপর।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ৭ কোটি টাকায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনকে নিয়োগ দিয়েছে ডিটিসিএ। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ডিটিসিএ এবং বুয়েটের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা মহানগর অঞ্চলের গণপরিবহন ব্যবস্থা আরও সমন্বিত, দক্ষ ও টেকসই করার লক্ষ্যে বিদ্যমান ম্যাস ট্রানজিট (মেট্রোরেল/বিআরটি) নেটওয়ার্কের পরিপূরক ও ফিডার সার্ভিস হিসেবে এলিভেটেড মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ডিটিসিএ’র সঙ্গে এ চুক্তি সই হয়েছে।
এদিন তেজগাঁও ডিটিসিএ ভবনে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে ডিটিসিএর পক্ষে অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান এবং বিআরটিসি-বুয়েটের পক্ষে বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশনের অধ্যাপক ড. সায়েদ ইশতিয়াক আহমেদ চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান।
প্রস্তাবিত সমীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ঢাকা মহানগর অঞ্চলে মনোরেলভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেল এবং অন্যান্য গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর কার্যকর সমন্বয়ের সুযোগ নিরূপণ করা। সমীক্ষার আওতায় প্রস্তাবিত পাঁচটি মনোরেল রুটসহ ঢাকা মহানগর অঞ্চলের অন্যান্য সম্ভাব্য রুট বিশ্লেষণ করে দুটি অগ্রাধিকারযোগ্য মনোরেল করিডোর চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্যায়ন করা হবে।
এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য মনোরেল রুট ও অ্যালাইনমেন্ট বিশ্লেষণ, স্টেশন ও ডিপোর উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ, যাত্রী চাহিদা প্রাক্কলন, কারিগরি ও কাঠামোগত উপযোগিতা যাচাই, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে মনোরেলের সংযোগ ও সমন্বয়ের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে। সমীক্ষাটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে এবং চুক্তি অনুযায়ী এর মেয়াদকাল ছয় মাস।
ঢাকা মহানগর অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, যাতায়াতের চাহিদা ও যানজটের প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত, বহুমাত্রিক ও কার্যকর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এবং সড়কের সীমিত প্রস্থের কারণে ভারী মেট্রোরেল অবকাঠামো নির্মাণে যেসব এলাকায় বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেসব এলাকায় মনোরেল একটি সম্ভাব্য বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মনোরেল সাধারণত উঁচু কাঠামোর ওপর পরিচালিত হয়। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সীমিত ভূমি ব্যবহারের মাধ্যমে গণপরিবহন সংযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কারিগরি উপযোগিতা, নির্মাণ ব্যয়, যাত্রী ধারণক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
প্রস্তাবিত সমীক্ষার ফলাফল ঢাকা মহানগর অঞ্চলের গণপরিবহন পরিকল্পনা, সম্ভাব্য মনোরেল করিডোর নির্বাচন, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল করিডোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেল এবং অন্যান্য গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে মনোরেলের সমন্বয়ের বিষয়টিও এতে খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে মেট্রোরেলের যাত্রীদের যাতায়াতের শেষ ধাপের সংযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
ঢাকায় মনোরেল নির্মাণ অনেক ব্যয়বহুল হবে। বুয়েটের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি হবে। এরপর পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পিডিপিপি তিন মাসের মধ্যেই তৈরি করা হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে ঢাকাবাসীকে মনোরেল উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ডিটিসিএ।
জানতে চাইলে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ম্যানেজার, ট্রাফিক সার্ভে (ডিজাইন অ্যান্ড প্ল্যানিং) (উপসচিব) মো. আসলাম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, মেট্রোরেলের গ্যাপ পূরণে মনোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা পাঁচটি রুট ঠিক করেছি। বুয়েটকে আরও দুটি রুট ঠিক করতে সমীক্ষা করতে বলেছি। মোট সাতটি রুটের মধ্যে আমরা প্রাথমিকভাবে দুটি রুটে মনোরেল নির্মাণ করবো।
২০২৯ সালের মধ্যেই দুটি মনোরেল ঢাকাবাসীকে উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমাদের দুটি রুটের প্রাথমিক পরিকল্পনা আছে। তবে বুয়েটের সমীক্ষার ওপর নির্ভর করবে এর নকশা কীভাবে হবে এবং কোন রুট অগ্রাধিকার পাবে’—যোগ করেন তিনি।
কবে নাগাদ মনোরেল চালু হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিটিসিএ-এর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৯ সালের ডিসেম্বরে দুটি লাইন চালু করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। সরকারের আকাঙ্ক্ষা অন্তত দুটি করিডোরে যেন মনোরেল চালু করতে পারি।