সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৭৫০ মিটার দৈর্ঘের শাহ আরেফিন-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। এক সঙ্গে পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ায় নঠিকাদারের কাজ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। সেতু নির্মাণকারী এলজিইডির তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেছেন।
রোববার (১৬ মে) রাতে প্রচণ্ড ঝড় হওয়ায় সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। তবে উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. নিজাম উদ্দিন বলেছেন, সেতুর আগের ঠিকাদার তমা কন্ট্রাকশনের লোকজন গার্ডারের কাছ তাদের রড সরিয়ে নিয়ে যাওয়ায় গার্ডারগুলো ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে।
নদী তীরের গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা টং দোকানদার মো. আলাউদ্দিন বলেন, রোববার রাতে এমন কোনো ঝড় হয়নি যে গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়তে পারে।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই গার্ডার ভেঙে গিয়ে সেতুটি চলাচলের উপযোগী হওয়ার পথে আরও জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য স্থানীয় বাসিন্দাদের। এর আগেও ২০২২ সালে সেতুটির দুটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়েছিল।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে যাদুকাটা নদীতে ৭৫০ মিটার দৈর্ঘের এই পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তমা কনস্ট্রাকশন নামের ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এর কাজ শুরু করে। পরে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও শেয় হয়নি সেতুর কাজ। এরপর গত বছর সেতুর কাজ শেষ না করেই চলে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেতুর নির্মাণকাজের চুক্তি বাতিল করে এলজিইডি।
গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, সেতুটি চালু হবে কবে এই অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না আমাদের। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পাঁচটি গার্ডার ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। মানুষ বলাবলি করছে, ঝড়ে নাকি গার্ডার ভেঙে ফেলছে। কিন্তু রোববার রাতে সেতুর গার্ডার ভেঙে পড়ার মতো কোনো ঝড় হয়নি। কারণ ঝড়ে আমার টং দোকানের কোনো ক্ষতি হয়নি। এত শক্ত সেতুর গার্ডার কীভাবে ভেঙে যাবে?
বাদাঘাট এলাকার বাসিন্দা বিএনপি নেতা আবুল হোসেন বলেন, সেতুর কাজ সঠিক সময়ে শেষ না হওয়ার জন্য সেতু নির্মাণকারী ঠিকাদার ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে। সেতুর গার্ডার নদীতে পড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, একটি সেতুর জন্য আমরা বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা করে যাচ্ছি। আট বছরেও সেতুর কাজ শেষ হয়নি। সেতুটি চালু হলে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটত। ব্যবসা-বাণ্যিজ্য ও সীমান্তের পর্যটনের দ্বার আরও প্রসারিত হতো, কিন্তু কাজ কবে শেষ হবে কেউ জানে না।
এলজিইডির সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, যাদুকাটা সেতুর পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে গেছে বলে জানা গেছে। শোনা যাচ্ছে ঝড়ের বাতাসে নাকি গার্ডার পড়ে গেছে। এটা বিশ্বাস হচ্ছে না, কারণ এত শক্তিশালী গার্ডার এভাবে পড়ে যাওয়ার কথা না। অন্য কোনো কারণে পড়তে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কন্ট্রাকশনের কারণেই সেতুর কাজ সময়মতো শেষ হয়নি। বারবার সময় বৃদ্ধি করেও কাজ শেষ করতে না পারায় তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করে সেতুর বাকি কাজ শেষ করা হবে। তমা কন্ট্রাকশনকে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে।
তমা কন্ট্রাকশনের যাদুকাটা সেতু প্রকল্পের দায়িত্বপাপ্ত ম্যানেজার প্রকৌশলী নবীন উল বিন জাহিদ বলেন, সেতুর ৭০ ভাগ কাজ করেছি। যাদুকাটা নদীতে পানির স্রোত বেশি, তাই সব সময় কাজ করা যায় না। এই সেতুতে আমাদের অনেক লোকসান হয়েছে। গার্ডারের উচ্চতা বেশি ও খুব খাড়া। ২০২২ সালে বন্যার কারণে দুটি গার্ডার নদীতে পড়েছিল। একটি গার্ডারে সঙ্গে আরেকটি গার্ডার রড দিয়ে সংযুক্ত করা ছিল। প্রচণ্ড বাতাসের কারণে একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লাগায় এক-একটি করে পাঁচটি গার্ডার নদীতে পড়ে গেছে।